একই বিষয়ে পড়াশোনা, শিক্ষার মানও হোক সমান
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্রমবর্ধমান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়—উচ্চশিক্ষার সুযোগ আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ বাড়লেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। এখন সময় এসেছে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আনার—একই বিষয়ে পড়াশোনা করা একজন শিক্ষার্থী দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডিগ্রি অর্জন করুন না কেন, তাঁর ন্যূনতম জ্ঞান, দক্ষতা ও একাডেমিক সক্ষমতার মান কি তুলনীয় হওয়া উচিত নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের খুব দূরে যেতে হবে না। বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহসহ একাধিক শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। বোর্ড আলাদা, প্রতিষ্ঠান আলাদা, শিক্ষক আলাদা এবং অঞ্চলভেদে শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধাতেও পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে নির্ধারিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা একটি অভিন্ন শিক্ষাগত কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষা গ্রহণ করে। অর্থাৎ বোর্ড আলাদা হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার মৌলিক জাতীয় মান এক।
এই ব্যবস্থার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন রয়েছে—প্রশাসনিক বৈচিত্র্য মানেই একাডেমিক মানের বিচ্ছিন্নতা নয়। একই দর্শন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও আরও সুসংগঠিতভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখন বহুমাত্রিক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিপুলসংখ্যক কলেজের পাশাপাশি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয় পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু একই বিষয়ের কারিকুলাম, কোর্সের কাঠামো, ক্রেডিট বণ্টন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, গবেষণার সুযোগ এবং লার্নিং আউটকাম বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভিন্ন হতে পারে। ফলে একই বিষয়ের একই নামের ডিগ্রি অর্জন করলেও দুই শিক্ষার্থীর একাডেমিক প্রস্তুতি ও দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
এখানে উদ্দেশ্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কমানো নয়। বরং প্রয়োজন একটি জাতীয় কোর কারিকুলাম। এর মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে—কোন জ্ঞানগুলো অপরিহার্য, একজন গ্র্যাজুয়েটের কী কী দক্ষতা থাকা উচিত, কতটুকু মূল কোর্স পড়তে হবে, গবেষণাপদ্ধতি কীভাবে শেখানো হবে এবং কোন লার্নিং আউটকাম অর্জন করা বাধ্যতামূলক হবে। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের গবেষণা, বিশেষায়ন ও একাডেমিক শক্তি অনুযায়ী অতিরিক্ত কোর্স ও ইলেকটিভ চালাতে পারবে।
বাংলা বিষয়ের কথাই ধরা যাক। দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজেই বাংলা বিষয়ে স্নাতক পড়ানো হোক না কেন, একজন শিক্ষার্থীর বাংলা ভাষার ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্য, আধুনিক বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, গবেষণাপদ্ধতি, একাডেমিক লেখালেখি এবং গবেষণাভিত্তিক কাজের ওপর একটি নির্ধারিত জাতীয় কম্পিটেন্সি থাকা উচিত। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এর সঙ্গে তুলনামূলক সাহিত্য, ডিজিটাল মানববিদ্যা, উন্নত সাহিত্যতত্ত্ব কিংবা বিশেষায়িত গবেষণার কোর্স যুক্ত করতে পারে। অর্থাৎ জাতীয় মান এক থাকবে, কিন্তু উৎকর্ষের পথ থাকবে আলাদা।
চিকিৎসা শিক্ষায় আমরা এর একটি কার্যকর উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখতে পাই। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নির্ধারিত এমবিবিএস কারিকুলাম ২০২১-এ চিকিৎসা শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়, বিষয় এবং পেশাগত পরীক্ষার কাঠামো নির্ধারিত রয়েছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধা বা একাডেমিক পরিবেশে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু একজন চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন পেশাগত ভিত্তি অপরিহার্য। কারণ চিকিৎসা শিক্ষার মান সরাসরি রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রকৌশল শিক্ষাতেও রয়েছে প্রোগ্রামভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা। বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন, সংক্ষেপে বায়েটি, নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রকৌশল শিক্ষার বিভিন্ন প্রোগ্রাম মূল্যায়ন করে। পাঠ্যক্রম, প্রোগ্রাম আউটকাম, শিক্ষার্থীর অর্জিত কম্পিটেন্সি এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির মতো বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু একজন শিক্ষার্থী কোথায় পড়েছেন তা নয়, তিনি কী শিখেছেন এবং কী করতে সক্ষম—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরির ক্ষেত্রে যদি জাতীয় মান ও কম্পিটেন্সি কাঠামো প্রয়োজন হয়, তাহলে বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, আইনসহ অন্যান্য বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য একটি জাতীয় একাডেমিক ভিত্তি থাকবে না কেন?
এমন একটি কাঠামো শিক্ষার বৈষম্য কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পড়াশোনা করে না। রাজধানীর একটি সুসজ্জিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি কলেজের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, গ্রন্থাগার বা গবেষণার সুযোগের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু অন্তত কী জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে একজন শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট করবেন—তার একটি জাতীয় নিশ্চয়তা থাকা উচিত।
এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। বর্তমানে অনেক সময় নিয়োগদাতারা একটি ডিগ্রির প্রকৃত একাডেমিক সক্ষমতা বোঝার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। যদি প্রতিটি বিষয়ের জাতীয় লার্নিং আউটকাম ও কম্পিটেন্সি কাঠামো থাকে, তাহলে একজন গ্র্যাজুয়েটের অর্জিত দক্ষতা আরও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উচ্চতর শিক্ষা, ক্রেডিট স্থানান্তর, একাডেমিক সমমান নির্ধারণ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একটি সুসংগঠিত জাতীয় কাঠামো সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু কারিকুলাম এক করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হবে না। এর সঙ্গে শিক্ষকের মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গ্রন্থাগার, প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি, গবেষণার সুযোগ, ডিজিটাল সম্পদ, মূল্যায়ন পদ্ধতি, একাডেমিক সততা এবং প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশনকে সমন্বিত মাননিশ্চয়তা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। কাগজে একটি অভিন্ন কারিকুলাম থাকলেই হবে না; শিক্ষার্থী বাস্তবে নির্ধারিত লার্নিং আউটকাম অর্জন করছে কি না, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, পেশাজীবী এবং প্রয়োজনে নিয়োগদাতা ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তারা নির্ধারণ করতে পারেন—একজন নির্দিষ্ট বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটের জন্য কোন জ্ঞান ও দক্ষতা অপরিহার্য এবং কীভাবে তা মূল্যায়ন করা হবে।
এই জাতীয় কারিকুলাম স্থির ও অপরিবর্তনীয় হওয়া উচিত নয়। প্রতি চার বা পাঁচ বছর পর তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, নতুন গবেষণা এবং পরিবর্তনশীল কর্মবাজার উচ্চশিক্ষার চরিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তাই জাতীয় কারিকুলামকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয় মানদণ্ড মানেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই জাতীয় কোর কারিকুলাম তৈরি করা সম্ভব। একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এগিয়ে থাকবে, অন্যটি কোনো বিশেষ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রোগ্রাম তৈরি করবে, আরেকটি স্থানীয় প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই বিষয়ের একজন গ্র্যাজুয়েটের ন্যূনতম একাডেমিক কম্পিটেন্সি যেন অযথা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভিন্ন না হয়।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা আমাদের দেখিয়েছে যে শিক্ষা বোর্ড আলাদা হয়েও একটি জাতীয় কারিকুলামের অধীনে কাজ করতে পারে। চিকিৎসা শিক্ষা দেখিয়েছে জাতীয় পেশাগত কারিকুলামের প্রয়োজনীয়তা। প্রকৌশল শিক্ষা দেখিয়েছে প্রোগ্রামের কম্পিটেন্সি ও আউটকাম কীভাবে অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায়। এখন সেই অভিজ্ঞতা থেকে উচ্চশিক্ষার অন্যান্য বিষয়ের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো তৈরির সময় এসেছে।
উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আলোচনা তাই শুধু কতটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে বা কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে—এতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: একই বিষয়ের দুই শিক্ষার্থী দেশের দুটি ভিন্ন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হলে তাঁদের ডিগ্রি কি ন্যূনতম একটি তুলনীয় একাডেমিক মানের প্রতিনিধিত্ব করবে?
বাংলাদেশের প্রয়োজন অভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নয়; প্রয়োজন তুলনীয় একাডেমিক মান।
একই বিষয়, একটি জাতীয় কোর কারিকুলাম; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন উৎকর্ষ—এই নীতিই হতে পারে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আরও মানসম্মত, সমতাভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার একটি বাস্তবসম্মত পথ।
বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা হোক, উৎকর্ষের পথ আলাদা হোক—কিন্তু একই বিষয়ের শিক্ষার মৌলিক মান যেন সারা দেশে এক থাকে।