শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কর্তৃক ১৩০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) ও গোয়েন্দা ঢাকা কর্তৃক বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধার Logo দ্বিতীয় লংমার্চ থেকে যেসব দাবিদাওয়া জানাল জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট Logo ডিএনসি কিশোরগঞ্জ কর্তৃক ২০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কর্তৃক ১৩২ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার Logo একই বিষয়ে পড়াশোনা, শিক্ষার মানও হোক সমান: ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান Logo সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে: ভেতরের দুর্বলতা যেন সরকারের অর্জনকে নষ্ট না করে Logo ডিএনসি গাজীপুর কর্তৃক ১৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কর্তৃক ১৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কর্তৃক ১৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার

সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে: ভেতরের দুর্বলতা যেন সরকারের অর্জনকে নষ্ট না করে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০ Time View
Update : শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন
সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে: ভেতরের দুর্বলতা যেন সরকারের অর্জনকে নষ্ট না করে
সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে: ভেতরের দুর্বলতা যেন সরকারের অর্জনকে নষ্ট না করে

সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে: ভেতরের দুর্বলতা যেন সরকারের অর্জনকে নষ্ট না করে
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়; সরকারের ভেতরের প্রশাসনিক দুর্বলতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, দখল, বিতর্কিত নিয়োগ এবং নাগরিক হয়রানির অভিযোগও সরকারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে দলীয় প্রভাবমুক্ত, প্রশাসন হবে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক এবং সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবে না। কিন্তু ২০২৬ সালের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রকাশ্য ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে এমন কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেগুলো এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকারের জন্য প্রথম বড় সতর্ক সংকেত এসেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে। জুলাই ২০২৬-এ The Daily Star-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপির নেতা-কর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব নিয়োগ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একজন সাবেক বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে The Daily Star-এর আরেকটি সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতাদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি দলীয় পদে থাকা অবস্থাতেই সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেটি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে এবং একজন সরকারি পদে থাকা ব্যক্তি দলীয় দায়িত্ব থেকে প্রকৃতপক্ষে কতটা পৃথক থাকতে পারছেন—সেটি। একটি সরকার যদি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাকেই দুর্বল করতে পারে।

মার্চ ২০২৬-এ দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। The Daily Star-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রশাসকের সবাই বিএনপির কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের নেতা ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত করার উদ্দেশ্যেই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে সরকারের বক্তব্য এবং সমালোচকদের উদ্বেগ—দুটিই বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়া যেন দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও কিছু ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পান। The Daily Star-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকজন কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আগেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিকও দেখায়—অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে, নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি, নাগরিক সেবা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর কতটা নির্ভর করতে হবে। একটি আধুনিক প্রশাসনে ডিজিটাল attendance, file tracking এবং service-delivery monitoring-এর মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব বিষয় নিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

নারায়ণগঞ্জের রাজউক-সংক্রান্ত বিষয়টিও বিশেষভাবে নজরে আনা প্রয়োজন। রাজউকের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ভবনমালিক ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হয়রানি, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নোটিশকে কেন্দ্র করে চাপ এবং অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মকর্তা মো. সারোয়ার-কে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। তবে এই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও বিচারিকভাবে প্রমাণিত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি; ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। বরং বিষয়টি তদন্তযোগ্য অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত। একই সময়ে সরকার নিজেও রাজউকের সেবা দ্রুত ও স্বচ্ছ করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয় উদ্বোধনের সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী রাজউকের সেবা নিয়ে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগের প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করেন এবং জানান, ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় কমিয়ে ২৪ দিনের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জের রাজউক কার্যালয়ের বিষয়ে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হবে কোনো ব্যক্তিকে আগে থেকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে গত কয়েক মাসের উচ্ছেদ অভিযান, নোটিশ, জরিমানা, অনুমোদন, নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট নাগরিক অভিযোগের একটি স্বাধীন প্রশাসনিক audit করা। কোন ভবনের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, কী আইনের অধীনে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, মালিক কী জবাব দিয়েছেন, জরিমানা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না এবং কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দাবি করেছেন কি না—এসব তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত সত্য স্পষ্ট হবে। অভিযোগ সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনামও রক্ষা করতে হবে।

চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়টিও সরকারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। জুন ২০২৬-এ নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীবকে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। The Daily Star ও TBS দুটোই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে; তবে সে সময় পুলিশ বলেছিল অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং অভিযোগের বিচারিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য ছিল না। এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে: কোনো ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত হলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের বাইরে থাকবে—এমন ধারণা যদি তৈরি হয়, তাহলে সরকারের জন্য তা অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। বরং দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অভিযোগের তদন্ত এবং আইনের প্রয়োগ হওয়া উচিত।

চাঁদাবাজি ও ভূমিদখল নিয়ে উদ্বেগ শুধু নারায়ণগঞ্জে সীমাবদ্ধ নয়। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ Transparency International Bangladesh বা TIB মিরপুরের Radda MCH-FP Centre-এ লুটপাট, ভাঙচুর ও দখল, কিশোরগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে জলাশয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এবং অন্যান্য ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। TIB বলেছে, চাঁদাবাজি ও ভূমিদখল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য গুরুতর সতর্ক সংকেত হতে পারে এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল ২০২৬-এ র‍্যাব জানিয়েছিল, সারাদেশে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে এমন প্রায় ৬৫০ ব্যক্তির একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ১১০ জনকে ‘top extortionists’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে র‍্যাব স্পষ্ট করেছিল যে তালিকাটি তখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ করার প্রক্রিয়া চলছিল। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না; একই সঙ্গে তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবেও ঘোষণা করা যায় না। সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক অভিযোগের পৃথক তদন্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা।

প্রশাসনের ভেতরেও স্থিতিশীলতা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। The Daily Star-এর জুলাই ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সচিব পর্যায়ের পদায়নের বিস্তার প্রশাসনিক কাঠামোকে top-heavy করে তুলছে এবং প্রচলিত পদক্রমের ওপর চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে বুঝতে হবে যে শুধু একজন কর্মকর্তা বদলি বা একজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তি ব্যক্তিগত প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারেন।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। একটি সরকারকে দুর্বল করার জন্য সবসময় বড় কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন প্রয়োজন হয় না। যদি স্থানীয় পর্যায়ে দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বাড়ে, যদি সরকারি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক চাপ অনুভব করেন, যদি সাধারণ মানুষ মনে করেন রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন, যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হয় এবং যদি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়—তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তখন সরকারের ভালো কাজগুলোও মানুষের কাছে গুরুত্ব হারাতে শুরু করবে।

প্রধানমন্ত্রীকে তাই এখনই একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—সরকারি পদ দলীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম নয় এবং দলের পরিচয় আইন ভঙ্গের ঢাল নয়। কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম করলে তদন্ত হবে; কোনো দলীয় নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে; কোনো অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও সুরক্ষা দেওয়া হবে। একইভাবে রাজউক, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, টেন্ডার এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ডিজিটাল monitoring, file tracking, service deadline এবং অভিযোগের independent review চালু করা প্রয়োজন।

সরকারের সামনে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটি হলো—দলীয় আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। একজন বিএনপি নেতা অন্যায় করলে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি কোনো সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন সাধারণ নাগরিককে হয়রানি করা হলে তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখা যাবে না; একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে তাকে অপরাধী ধরে নেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন একই আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়।

প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের জন্য এটি তাই কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়; বরং সময়মতো সতর্ক হওয়ার বিষয়। বর্তমান সরকারের অর্জন, জনগণের প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা রক্ষা করতে হলে সরকারকে নিজের ঘরের সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে আগে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করবেই—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সরকারের নিজের লোকের অন্যায়, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রভাব যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সেই দুর্বলতাই একদিন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের কাছে শুধু ক্ষমতা প্রত্যাশা করে না; তারা চায় নিরাপদ রাষ্ট্র, ন্যায়সংগত প্রশাসন, দ্রুত সরকারি সেবা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি পরিষ্কার নীতি—“দল নয়, রাষ্ট্র আগে; ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান আগে; প্রভাব নয়, আইন আগে।” এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সরকার তার জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে পারবে। আর যদি অনিয়ম, চাঁদাবাজি, দখল, প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ছোট ঘটনা মনে করে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আজকের ছোট ছোট অভিযোগ ভবিষ্যতে অনেক বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটে রূপ নিতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : JEWEL