মোবাইলের আলো নয়, অদেখা সমস্যাটিই কি আমাদের চোখের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি?
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো,
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ),মালয়েশিয়া।
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক
রাতের খাবার শেষ করে পরিবারের সবাই বসেছেন। কারও হাতে স্মার্টফোন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, কেউ ভিডিও দেখছেন, আবার কেউ অফিসের অসমাপ্ত কাজ শেষ করছেন। ছোট শিশুটিও মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে সময় কাটাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর কারও চোখ জ্বালা করছে, কারও মাথাব্যথা হচ্ছে, কেউ বারবার চোখ কচলাচ্ছেন। তখন পরিবারের একজন বলে উঠলেন, “মোবাইলের আলোতেই চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!”
কিন্তু সত্যিই কি মোবাইলের আলোই আমাদের চোখের সবচেয়ে বড় শত্রু? নাকি দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসের আড়ালে এমন কিছু সমস্যা লুকিয়ে আছে, যেগুলো আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি না?
চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় এই প্রশ্নটি জরুরি। কারণ, স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে হওয়া অস্বস্তি যেমন বাস্তব, তেমনি সব ধরনের চোখের সমস্যাকে মোবাইলের আলো দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ভুল। কখনো সমস্যাটি চোখের শুষ্কতা, কখনো অচিহ্নিত দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি, আবার কখনো এমন কোনো রোগের লক্ষণ, যার জন্য প্রয়োজন পেশাদার পরীক্ষা।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ক্লান্ত হয় কেন?
কম্পিউটার, স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট ব্যবহারের সময় আমরা সাধারণত দীর্ঘক্ষণ কাছের কোনো বস্তুর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকি। এতে চোখের ফোকাস করার ব্যবস্থাকে একটানা কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় অনেকের চোখের পলক ফেলার হার কমে যায় বা পলক অসম্পূর্ণভাবে পড়ে। ফলে চোখের পৃষ্ঠে অশ্রুর স্তর ঠিকভাবে ছড়িয়ে না-ও পড়তে পারে।
এর ফল হিসেবে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, বালুকণার মতো অনুভূতি, চোখ ভারী লাগা কিংবা সাময়িক ঝাপসা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর মাথাব্যথা বা চোখের চারপাশে অস্বস্তিও হতে পারে। এসব উপসর্গকে সাধারণভাবে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা ডিজিটাল চোখের ক্লান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে: স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখে অস্বস্তি হলেই চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনেক ক্ষেত্রে বিরতি নেওয়া, চোখের পলক সচেতনভাবে ফেলা এবং পরিবেশের পরিবর্তনের মাধ্যমে উপসর্গ কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে বড় ভুল: সব সমস্যার জন্য মোবাইলকে দায়ী করা
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বোর্ডের লেখা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। বাড়িতে পড়ার সময় সে বই কাছে নিয়ে আসে। অভিভাবক মনে করছেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণেই এমন হয়েছে। তাই ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিন্তু কয়েক দিন পরও সমস্যাটি রয়ে গেল।
এ ক্ষেত্রে শিশুটির মায়োপিয়া বা অন্য কোনো প্রতিসরণজনিত দৃষ্টিসমস্যা থাকতে পারে। আবার অন্য কারণও সম্ভব। পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।
একইভাবে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কম্পিউটারে কাজ করার পর ঝাপসা দেখছেন বলে ধরে নেওয়া যায় না যে সমস্যাটি শুধু স্ক্রিনের কারণে। তাঁর আগে থেকে থাকা চশমার পাওয়ারের ত্রুটি, চোখের শুষ্কতা কিংবা অন্য কোনো চক্ষুসমস্যা থাকতে পারে।
মোবাইল ব্যবহারের সঙ্গে চোখের অস্বস্তির সম্পর্ক থাকলেও সব দৃষ্টিসমস্যার একমাত্র কারণ মোবাইল নয়। অতএব, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানোর পাশাপাশি উপসর্গের প্রকৃতি, স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য লক্ষণও বিবেচনায় নিতে হবে।
নীল আলো কি সত্যিই চোখ অন্ধ করে?
স্মার্টফোনের নীল আলো নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। অনেকেই মনে করেন, এই আলো সরাসরি রেটিনা নষ্ট করে দেয় অথবা অল্প বয়সেই চোখের স্থায়ী ক্ষতি ঘটায়। কিন্তু স্বাভাবিক দৈনন্দিন ব্যবহারে ফোনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো মানুষের রেটিনায় স্থায়ী ক্ষতি করে—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে রাতে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার কোনো সমস্যাই তৈরি করে না। সন্ধ্যা বা রাতে উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, বিশেষত ঘুমানোর ঠিক আগে, ঘুম আসতে দেরি করাতে পারে এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আবার দীর্ঘক্ষণ কাছের কাজ করার ফলে চোখে ক্লান্তি বা অস্বস্তিও হতে পারে।
তাই শুধু নীল আলোকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, বিরতি, ঘুমের অভ্যাস, কাজের দূরত্ব এবং চোখের উপসর্গের দিকে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর। নীল আলো কমানোর সেটিং ব্যবহার করতে পারেন, যদি এতে আরাম লাগে; তবে এটি চোখের রোগ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নয়।
চোখের শুষ্কতা: ছোট উপসর্গ, বড় অস্বস্তি
ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সাধারণ সমস্যা হলো চোখের শুষ্কতা। চোখের অশ্রু শুধু চোখকে ভেজা রাখে না; এটি চোখের পৃষ্ঠকে সুরক্ষিত রাখতে এবং স্পষ্ট দৃষ্টিতে সহায়তা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যখন অশ্রুর স্তরের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়, তখন চোখে জ্বালাপোড়া, খচখচে অনুভূতি, লালচে ভাব কিংবা ওঠানামা করা ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দিতে পারে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘর, সরাসরি ফ্যানের বাতাস, ধুলাবালি এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
কিছু সহজ অভ্যাস উপকার করতে পারে:
বিশেষ করে, লালভাব কমানোর জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের আই ড্রপ শুষ্ক চোখের উপযুক্ত চিকিৎসা নয়। উপসর্গের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্বাচন করা প্রয়োজন।
শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি কেন?
শিশুরা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; তবে তাদের চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনাকে শুধু মোবাইলের সময়সীমায় আটকে রাখা উচিত নয়।
একটি শিশু বোর্ডের লেখা দেখতে না পেলে, বারবার চোখ কুঁচকে তাকালে, বই খুব কাছে ধরে পড়লে কিংবা পড়ার সময় মাথাব্যথার কথা বললে তার দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে। শিশুরা সব সময় নিজের সমস্যাটি বুঝতে পারে না বা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অভিভাবক ও শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের বয়সোপযোগী স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ থাকা দরকার। বিশেষ করে শিশুদের মায়োপিয়ার ঝুঁকি কমানোর আলোচনায় বাইরে সময় কাটানোর গুরুত্ব রয়েছে। তবে স্ক্রিন কমানো বা বাইরে খেলাধুলা করা—কোনোটিই প্রয়োজনীয় চক্ষু পরীক্ষার বিকল্প নয়।
শিশুর চোখে সমস্যা সন্দেহ হলে তাকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে রাখলেই সমাধান হবে, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
স্ক্রিন ব্যবহারের পর সামান্য অস্বস্তি হলে বিরতি নিয়ে উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা বারবার হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা উপযুক্ত চোখের স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিচের লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না:
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, তীব্র চোখব্যথা, চোখে আঘাত, আলোর ঝলক বা নতুন করে অনেক ভাসমান দাগ দেখা—বিশেষ করে এর সঙ্গে পর্দার মতো ছায়া নামলে—জরুরি মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে স্ক্রিন কমিয়ে কয়েক দিন অপেক্ষা করা উচিত নয়।
প্রযুক্তিকে বাদ নয়, ব্যবহারকে স্বাস্থ্যসম্মত করতে হবে
আজকের পৃথিবীতে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ডিজিটাল পর্দা শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সমাধান প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
পরিবারে শিশুদের জন্য বয়সোপযোগী নিয়ম থাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিননির্ভর কার্যক্রমের মাঝে বিরতি রাখা এবং কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত আলো ও বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চোখের উপসর্গ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যক্তিগত অভ্যাসের পাশাপাশি সহজলভ্য পরীক্ষা, মানসম্মত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় চশমা পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা দরকার। কারণ, অনেক সময় যে সমস্যাকে আমরা মোবাইলের ফল বলে ধরে নিই, সেটির পেছনে থাকতে পারে এমন একটি দৃষ্টিসমস্যা, যার সমাধান সম্ভব।
শেষ কথা: আলোকে ভয় নয়, সমস্যাকে চিনুন
মোবাইলের পর্দা আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু পর্দার আলো নিয়ে ভয় পেতে গিয়ে চোখের প্রকৃত সমস্যাকে উপেক্ষা করা আরও বড় ভুল হতে পারে।
চোখে অস্বস্তি হলে কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত বিরতি নিন, চোখের শুষ্কতা কমানোর উপযুক্ত অভ্যাস গড়ে তুলুন, শিশুদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করুন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার পরীক্ষা করান। সব উপসর্গকে মোবাইলের দোষ না দিয়ে, আবার সব সমস্যাকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবেও অবহেলা করবেন না।
চোখের যত্নের প্রথম পদক্ষেপ মোবাইল বন্ধ করা নয়; বরং চোখ কী বলতে চাইছে, তা গুরুত্ব দিয়ে শোনা।
World Sight Day-এর বার্তা হোক—প্রযুক্তির সঙ্গে থাকুন, কিন্তু নিজের দৃষ্টিশক্তির প্রতি সচেতন থাকুন।