বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশাজীবীরা কেন Rehabilitation Council-এ অন্তর্ভুক্ত হবেন: জনস্বাস্থ্য, পেশাগত স্বীকৃতি ও বাস্তবতার আলোকে একটি বিশ্লেষণ
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান,
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক।
সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটি (BOS)
দৃষ্টি মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনমানের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। একটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে চক্ষুস্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও International Agency for the Prevention of Blindness (IAPB) দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে যে, প্রতিরোধযোগ্য দৃষ্টিহীনতা কমাতে হলে শুধু উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন দক্ষ ও সুষমভাবে বণ্টিত চক্ষুস্বাস্থ্য মানবসম্পদ।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ছানি অপারেশন বৃদ্ধি, বিভিন্ন বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালের সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে অনেক মানুষ চক্ষুসেবা পাচ্ছেন। তবে দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং প্রশিক্ষিত সহযোগী চক্ষুস্বাস্থ্য পেশাজীবীর সংখ্যা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম।
IAPB-এর Bangladesh Eye Care Situation Analysis Tool (ECSAT) 2019 প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ পরিকল্পনা, পেশাগত নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের চক্ষু স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যকর অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এখনও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অপটোমেট্রিস্ট ও অপটিশিয়ানদের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো এবং সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের একটি উপযুক্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা সময়ের দাবি। বর্তমান বাস্তবতায় Rehabilitation Council-এর আওতায় অপটোমেট্রিস্টদের অন্তর্ভুক্তি হতে পারে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
অনেক সাধারণ মানুষের ধারণা, অপটোমেট্রিস্টের কাজ কেবল চশমার পাওয়ার নির্ধারণ করা। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে অপটোমেট্রির পরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। World Council of Optometry (WCO) অপটোমেট্রিকে একটি স্বাধীন (Autonomous), শিক্ষিত (Educated) এবং নিয়ন্ত্রিত (Regulated) স্বাস্থ্য পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একজন প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্ট দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, রিফ্রাকটিভ ত্রুটি নির্ণয়, চশমা ও কন্টাক্ট লেন্স ব্যবস্থাপনা, বাইনোকুলার ভিশন মূল্যায়ন, চোখের বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ, রোগীকে যথাযথ চিকিৎসকের কাছে রেফার করা এবং Low Vision ও Vision Rehabilitation সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে অপটোমেট্রিস্টরা Primary Eye Care-এর প্রথম সারির স্বাস্থ্যসেবাকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বহু দেশে অপটোমেট্রিস্টদের জন্য নির্দিষ্ট আইন, নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং পেশাগত দায়িত্বের পরিধি নির্ধারিত রয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং শ্রীলঙ্কাতেও অপটোমেট্রি শিক্ষার উন্নয়ন, পেশাগত সংগঠন এবং সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে এই পেশাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশাজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল, এনজিও পরিচালিত চক্ষু প্রকল্প, বিশেষায়িত দৃষ্টি কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অপটিক্যাল সেবাখাতে কাজ করে আসছেন। তারা রিফ্রাকশন সেবা, শিশুদের দৃষ্টি মূল্যায়ন, কন্টাক্ট লেন্স সেবা, Low Vision ব্যবস্থাপনা এবং চক্ষুরোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে দৃষ্টিসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে অপটোমেট্রিস্টরাই রোগী ও চক্ষু বিশেষজ্ঞের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারাল সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অপটোমেট্রি পেশা এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। ফলে পেশার Scope of Practice, নিবন্ধন, নৈতিক আচরণবিধি, শিক্ষার জাতীয় মানদণ্ড এবং দক্ষতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা রয়ে গেছে। এর ফলে একদিকে যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্টরা যথাযথ মর্যাদা ও পেশাগত পরিচয় থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত সেবাদানকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে অসুবিধার সম্মুখীন হন।
এই সীমাবদ্ধ বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের অপটোমেট্রি পেশাকে সংগঠিত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার ক্ষেত্রে Bangladesh Optometric Society (BOS) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। BOS বাংলাদেশের অপটোমেট্রিস্টদের একমাত্র সরকার নিবন্ধিত জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন, যা আন্তর্জাতিকভাবে World Council of Optometry (WCO) এবং Asia Pacific Council of Optometry (APCO)-এর স্বীকৃত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে অপটোমেট্রি শিক্ষার মানোন্নয়ন, পেশাগত ঐক্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম, পেশাগত নৈতিকতা এবং সরকারি স্বীকৃতির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, একটি স্বাস্থ্য পেশার উন্নয়নে শক্তিশালী পেশাজীবী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসক, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট বা অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশার মতো অপটোমেট্রি ক্ষেত্রেও একটি ঐক্যবদ্ধ পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অপটোমেট্রিস্টদের Rehabilitation Council-এর অন্তর্ভুক্তি কেবল পেশাগত স্বীকৃতির বিষয় নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা, সেবার মান এবং জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। প্রথমত, এর মাধ্যমে একটি সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। নিবন্ধিত অপটোমেট্রিস্টদের একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরি হলে সরকার সহজেই এই মানবসম্পদের সংখ্যা, দক্ষতা ও অবস্থান সম্পর্কে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, পেশার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতার মান, নৈতিক আচরণবিধি এবং পেশাগত দায়িত্বের পরিধি নির্ধারণ করা সহজ হবে। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত চর্চা কমবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও মানসম্পন্ন সেবা পাবেন। তৃতীয়ত, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও নিম্নদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের পুনর্বাসনে অপটোমেট্রিস্টদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। Low Vision Assessment, Visual Aid Prescribing, Vision Training এবং Rehabilitation Referral-এর মাধ্যমে একজন অপটোমেট্রিস্ট প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা ও কর্মজীবনে ফিরে আসার সুযোগ বৃদ্ধি করতে পারেন। চতুর্থত, সরকারের Universal Health Coverage এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জনে অপটোমেট্রিস্টদের সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অপটোমেট্রি পেশা একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা, পেশাগত সংগঠন, আইনগত স্বীকৃতি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি বিকশিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অপটোমেট্রিস্টদের জন্য পৃথক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা প্রাথমিক চক্ষুসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতে এখনও জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ Optometry Council প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও Optometry Confederation of India (OCI) শিক্ষার মান নির্ধারণ, পেশাগত পরিচয় এবং নীতিগত স্বীকৃতির জন্য কাজ করছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়ায় অপটোমেট্রি শিক্ষা ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে একটি বাস্তবসম্মত পথনির্দেশনা দিতে পারে।
অপটোমেট্রি একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য পেশা হওয়ায় ভবিষ্যতে পৃথক Optometry Council প্রতিষ্ঠা একটি যৌক্তিক লক্ষ্য হতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তাৎক্ষণিকভাবে একটি নতুন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা প্রশাসনিক, আর্থিক ও আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জিং। একটি নতুন কাউন্সিল গঠনের জন্য প্রয়োজন সংসদীয় আইন, প্রশাসনিক অবকাঠামো, অর্থায়ন, জনবল, নিবন্ধন ব্যবস্থা, শিক্ষা মানদণ্ড, পরীক্ষাব্যবস্থা এবং তদারকি কাঠামো। যেহেতু বাংলাদেশের অপটোমেট্রি পেশা এখনও জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বাইরে রয়েছে, তাই প্রথম ধাপে বিদ্যমান Rehabilitation Council-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কৌশল হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে একটি স্বতন্ত্র Optometry Council প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের চক্ষুস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে অপটোমেট্রিস্টদের দক্ষতা ও অবদানকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের দৃষ্টিসেবা নিশ্চিত করে আসছেন। কিন্তু একটি স্বীকৃত নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পেশার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। Rehabilitation Council-এর আওতায় অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি কোনো গোষ্ঠীগত দাবি নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করা এবং দেশের চক্ষুস্বাস্থ্য মানবসম্পদকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের একটি প্রয়োজনীয় জাতীয় উদ্যোগ।
একটি সুসংগঠিত, নিবন্ধিত এবং দায়িত্বশীল অপটোমেট্রি পেশা বাংলাদেশের “সবার জন্য মানসম্মত দৃষ্টিসেবা” অর্জনের পথে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। ভবিষ্যতে সময়, প্রয়োজন ও নীতিগত প্রস্তুতির আলোকে স্বতন্ত্র Optometry Council প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকবে; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় Rehabilitation Council-এর অন্তর্ভুক্তিই হতে পারে বাংলাদেশের অপটোমেট্রি পেশার উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত প্রথম পদক্ষেপ।