শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo ব্রাজিল নাকি হাইতি, সুপার কম্পিউটারের প্রেডিকশনে কে জিতবে Logo বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার বিস্তার: চোখের স্বাস্থ্যসেবায় সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি Logo আদ-দ্বীন হাসপাতাল: বন্ধ নয়, জবাবদিহি ও সংস্কারের সুযোগ প্রয়োজন Logo বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? Logo আবারো ঢাকা মেট্রো (উত্তর), ঢাকা গোয়েন্দা ও নোয়াখালী কর্তৃক বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধার Logo রায় কার্যকর হলে আমি শতভাগ সন্তুষ্ট হব: রামিসার বাবা Logo অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের নিবন্ধন ও নীতিমালা কাঠামো: উন্নত চক্ষুসেবার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ Logo বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার চেয়ে বড় ফেভারিট ব্রাজিল, বললেন মেসি Logo রাতের মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে Logo বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৭ Time View
Update : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৩:৩৫ অপরাহ্ন
বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে নীরব বিপ্লব ঘটানোর সক্ষমতা রয়েছে অপটোমেট্রি পেশার। বিশ্বজুড়ে অপটোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চোখের পরীক্ষা, দৃষ্টিজনিত সমস্যার নির্ণয়, চশমা ও কনট্যাক্ট লেন্স প্রেসক্রিপশন প্রদান, দৃষ্টিশক্তি পুনর্বাসন এবং অনেক ক্ষেত্রে চোখের রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশা পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিল। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের আওতায় অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের নিবন্ধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেকের কাছে এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তারপরও বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক ও নানা ধরনের অপতৎপরতা থেমে নেই। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্নভাবে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে, যাতে এর পরিধি আর সম্প্রসারিত না হয় এবং এটি একটি কার্যকর ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় পরিণত হতে না পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এবং কেন এই আইনগত স্বীকৃতি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে?

প্রথমত, একটি বড় অংশের মানুষ এখনো অপটোমেট্রিস্টদের কাজের পরিধি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। অনেকেই মনে করেন, অপটোমেট্রিস্ট মানেই চশমার দোকানে বসে পাওয়ার মাপা ব্যক্তি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একজন প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্ট একজন স্বতন্ত্র প্রাথমিক চক্ষুস্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পেশাজীবী। অপটোমেট্রিস্ট, অপথালমোলজিস্ট এবং অপটিশিয়ানের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও আমাদের দেশে এই পার্থক্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের কাছেও অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছায় এবং আইনগত স্বীকৃতির যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

দ্বিতীয়ত, যদি অপটোমেট্রি কাউন্সিল বা নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মানসম্মত নয় বা যাদের ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তারা সমস্যায় পড়বেন। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, অননুমোদিত কোর্স কিংবা অস্পষ্ট একাডেমিক পটভূমি নিয়ে অনেকেই নিজেদের অপটোমেট্রিস্ট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠিত হলে কারা প্রকৃত অর্থে নিবন্ধিত হওয়ার যোগ্য, তা নির্ধারণ করা হবে। ফলে অনেকের পেশাগত অবস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এই গোষ্ঠী আইনগত স্বীকৃতি প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করতে আগ্রহী।

তৃতীয়ত, দেশে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা নিজেদের “অপটোমেট্রিস্ট” হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের প্রকৃত যোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তারা হয়তো অপটিক্যাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু স্বীকৃত অপটোমেট্রি শিক্ষা গ্রহণ করেননি। পেশাগত পরিচয়ের এই অপব্যবহার শুধু জনগণকে বিভ্রান্তই করে না, বরং প্রকৃত অপটোমেট্রিস্টদের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করে। একটি নিবন্ধনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে এসব পরিচয়ের সত্যতা যাচাই সম্ভব হবে। তাই অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করেন।

চতুর্থত, দেশে “ছদ্ম অপটোমেট্রিস্ট” বা পসুডো অপটোমেট্রিস্টদের দৌরাত্ম্যও একটি বড় সমস্যা। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা দক্ষতা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চোখের পরীক্ষা, পাওয়ার নির্ধারণ এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছেন এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। গ্রামীণ ও শহরতলির এলাকায় এদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যায়। জনগণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক বাজার তৈরি করেছেন। ফলে আইনগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পঞ্চমত, বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসা অনেক দক্ষ অপটোমেট্রিস্ট পেশাগত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন। ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের অপটোমেট্রি ডিগ্রি অর্জনকারী পেশাজীবীরা যখন দেশে ফিরে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক চর্চা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, তখন বিদ্যমান অগোছালো ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়। মানসম্মত শিক্ষা, নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুসরণের দাবি অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে পেশার ভেতরেই বিভাজন তৈরি হয়, যা আইনগত স্বীকৃতির আন্দোলনকে দুর্বল করে।

ষষ্ঠত, কিছু অপটোমেট্রিস্ট নিজেদের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থে অপথালমোলজিস্টদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যান, যা পেশাগত স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এখানে স্পষ্ট করে বলা জরুরি যে, অধিকাংশ চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অপটোমেট্রিস্ট পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু কিছু ব্যক্তি নিজেদের সুবিধার জন্য নির্ভরশীলতার একটি সংস্কৃতি বজায় রাখতে চান। ফলে অপটোমেট্রিস্টদের স্বাধীন পেশাগত পরিচয় এবং আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আড়ালে পড়ে যায়।

সপ্তমত, ডিগ্রিবিহীন ব্যক্তিদের অপটোমেট্রিস্ট পরিচয় ব্যবহার করার ফলে পেশাটিতে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে, কেউবা শুধু অভিজ্ঞতার দাবি করে নিজেদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত যোগ্য পেশাজীবীকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। একই সঙ্গে ভুল চিকিৎসা, দৃষ্টিজনিত জটিলতা এবং রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের ঝুঁকিও বাড়ছে। একটি শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা জনগণকে নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে পারে।

সবশেষে, অপটোমেট্রি পেশার অভ্যন্তরীণ ঐক্যের অভাবও বড় একটি কারণ। বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবীদের মধ্যে মতভেদ অনেক সময় বৃহত্তর স্বার্থকে পিছিয়ে দেয়। কে নেতৃত্ব দেবে, কোন ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য হবে কিংবা কার প্রতিনিধিত্ব কতটুকু থাকবে—এসব প্রশ্নে বিভক্তি তৈরি হয়। অথচ একটি পেশার আইনগত স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।

বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্য সেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো প্রাথমিক দৃষ্টিসেবা থেকে বঞ্চিত। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, গ্লুকোমা, শিশুদের রিফ্র্যাকটিভ এরর, নিম্নদৃষ্টি পুনর্বাসনসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ অপটোমেট্রিস্টদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রাথমিক চক্ষুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

এই বিরোধিতার পেছনে নানা কারণ কাজ করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালু হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ডের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হবে। আবার অনেকে মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে জনস্বার্থে গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের অধীনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু অপটোমেট্রি পেশার মর্যাদাই প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং জনগণকে নিরাপদ ও মানসম্মত চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে কে প্রকৃত অর্থে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য অপটোমেট্রিস্ট এবং কে নন—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে ভুয়া পরিচয়ে সেবা প্রদান, পেশাগত নৈরাজ্য এবং রোগীদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।

অতএব, এখন প্রয়োজন বিভ্রান্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা। অপটোমেট্রি পেশার যথাযথ বিকাশ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি দেশের চক্ষুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি অপরিহার্য শর্ত।

অতএব, অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কাউন্সিল গঠন, শিক্ষাগত মান নির্ধারণ, নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু এবং পেশাগত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণ নিরাপদ ও মানসম্পন্ন চক্ষুস্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।

সময় এসেছে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার। অপটোমেট্রিস্টদের যথাযথ আইনগত স্বীকৃতি শুধু একটি পেশার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৃষ্টিস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।
প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটি (বিওএস)।
অপটোমেট্রি পেশাজীবী ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : JEWEL