বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে যেমন চিকিৎসাসেবার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সেবার মান, অবকাঠামোগত সক্ষমতা, জনবল সংকট এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালে একাধিক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিঃসন্দেহে নবজাতকের মৃত্যু একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক ঘটনা, যা কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান, এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে যদি প্রাণহানি ঘটে, তবে তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে—কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর ত্রুটি বা অব্যবস্থাপনা ধরা পড়লে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়াই কি একমাত্র এবং সর্বোত্তম সমাধান? নাকি কঠোর জবাবদিহি, আর্থিক জরিমানা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং নিবিড় তদারকির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে?
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, আদ-দ্বীন হাসপাতালকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে কঠোর শর্তসাপেক্ষে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া অধিক বাস্তবসম্মত এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত হতে পারত। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ, সংশ্লিষ্ট ইউনিট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে তিন মাস বা তারও বেশি সময় ধরে নিবিড় তদারকি চালানো সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল নয়, অনেক সরকারি হাসপাতালেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা কম, অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে, জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত চাপ থাকে এবং কখনো কখনো অবকাঠামোগত দুর্বলতাও দেখা যায়। এসব সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা ত্রুটি, বিলম্ব বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। যদি শুধুমাত্র ত্রুটি বা অব্যবস্থাপনার কারণেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে দেশের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানই একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অবশ্যই এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন—এই যুক্তি কোনোভাবেই অবহেলা, দুর্নীতি বা চিকিৎসা ত্রুটিকে সমর্থন করে না। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে সংস্কার করা, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। কারণ একটি হাসপাতাল কেবল একটি ভবন নয়; এটি হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসার আশ্রয়স্থল, শত শত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মচারীর কর্মস্থল এবং সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি পরিচিত নাম। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান অনেকেই স্বীকার করেন। একটি প্রতিষ্ঠানের কিছু ইউনিটে বা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর সমস্যা থাকলে সেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা জরুরি। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দিলে হাজার হাজার রোগী হঠাৎ করে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিশেষ করে যেসব রোগী চলমান চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
এছাড়া একটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য কর্মচারীদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুলের জন্য শত শত নিরপরাধ কর্মীও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাধারণত ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রথমে তদন্ত, তারপর সংশোধনী নির্দেশনা, আর্থিক জরিমানা, লাইসেন্সের শর্ত কঠোর করা, নির্দিষ্ট বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকের মাধ্যমে তদারকি করা হয়। কেবল তখনই সম্পূর্ণ লাইসেন্স বাতিল বা প্রতিষ্ঠান বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যখন প্রতিষ্ঠানটি বারবার একই ভুল করে, সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় অথবা জননিরাপত্তার জন্য সরাসরি ও অব্যাহত হুমকি হিসেবে প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশেও এমন একটি জবাবদিহিমূলক ও সংস্কারমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যখাতের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভুল শনাক্ত করা, সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করা এবং স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা। শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না; অনেক সময় কাঠামোগত সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ফল দেয়।
নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের কষ্ট কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। যদি কোনো ব্যক্তি, বিভাগ বা প্রশাসনিক পর্যায়ে অবহেলা প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
একই সঙ্গে এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য নিয়মিত অডিট, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি সেবা মূল্যায়ন, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের মান যাচাই এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যদি একটি ঘটনার পর শুধুমাত্র একটি হাসপাতালকে শাস্তি দেওয়া হয় কিন্তু পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো অক্ষত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা অন্য কোথাও ঘটার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সুতরাং, একটি উন্নত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূলনীতি হওয়া উচিত—জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সংস্কার এবং রোগীর নিরাপত্তা। শাস্তি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই শাস্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং সেবার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আদ-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কঠোর জরিমানা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, স্বাধীন তদারকি কমিটি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হলে হয়তো একই সঙ্গে ন্যায়বিচার এবং জনস্বার্থ উভয়ই অধিকতর সুরক্ষিত হতো।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে হলে আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ভুলের জন্য জবাবদিহি থাকবে, কিন্তু সংশোধনের সুযোগও থাকবে। কারণ একটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া তুলনামূলক সহজ সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু একটি হাসপাতালকে নিরাপদ, দক্ষ এবং জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক