বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo ইতিহাস গড়ে গিনেস বুকে রোনালদো Logo দুর্নীতি আর দুর্ব্যবস্থায় আমরা গলা পর্যন্ত ডুবছি: সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন? Logo চক্ষুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের প্রয়োজন Logo ব্রাজিল নাকি হাইতি, সুপার কম্পিউটারের প্রেডিকশনে কে জিতবে Logo বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার বিস্তার: চোখের স্বাস্থ্যসেবায় সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি Logo আদ-দ্বীন হাসপাতাল: বন্ধ নয়, জবাবদিহি ও সংস্কারের সুযোগ প্রয়োজন Logo বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? Logo আবারো ঢাকা মেট্রো (উত্তর), ঢাকা গোয়েন্দা ও নোয়াখালী কর্তৃক বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধার Logo রায় কার্যকর হলে আমি শতভাগ সন্তুষ্ট হব: রামিসার বাবা Logo অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের নিবন্ধন ও নীতিমালা কাঠামো: উন্নত চক্ষুসেবার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

দুর্নীতি আর দুর্ব্যবস্থায় আমরা গলা পর্যন্ত ডুবছি: সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ Time View
Update : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ২:৪০ অপরাহ্ন
দুর্নীতি আর দুর্ব্যবস্থায় আমরা গলা পর্যন্ত ডুবছি: সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন?
দুর্নীতি আর দুর্ব্যবস্থায় আমরা গলা পর্যন্ত ডুবছি: সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ যে কয়েকটি সমস্যার কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করেন, তার মধ্যে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্ব্যবস্থা এবং সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে হয়রানি অন্যতম। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখনো মনে করেন, সরকারি সেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে অধিকার নয়, বরং এক ধরনের সংগ্রাম। অফিসে অফিসে ঘুরতে হয়, ফাইল আটকে থাকে, দালালের শরণাপন্ন হতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়া কাজ এগোয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রশ্ন হলো, এত সরকার পরিবর্তন, এত সংস্কার উদ্যোগ, এত ডিজিটাল রূপান্তরের পরও কেন পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে না?

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। জনগণের একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দুর্নীতি না করে বরং সৎভাবে দায়িত্ব পালন করাই যেন ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধারণা বাস্তবতার পুরো প্রতিফলন না হলেও এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো মূলত জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত। একজন সরকারি কর্মচারী রাষ্ট্রের মালিক নন; তিনি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি ব্যবস্থার কর্মচারী মাত্র। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে এমন এক মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়, যেন জনগণ তাদের কাছে সেবা নিতে নয়, অনুগ্রহ চাইতে এসেছে। এই মানসিকতাই প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার অন্যতম কারণ।

দুর্নীতির বিষয়টি কেবল অর্থ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতিতে পক্ষপাত, টেন্ডার বাণিজ্য, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং জবাবদিহির অভাব—সবই দুর্নীতির অংশ। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পায়, তখন সেখানে দক্ষতা ও সততার চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে পুরো ব্যবস্থার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, সময় বেড়েছে এবং প্রত্যাশিত মান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও সব প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে এমন দাবি করা যাবে না, তবে জনমনে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, সেটি দূর করার জন্য আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের করের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জানার অধিকার জনগণেরই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার দুর্নীতি ও অনিয়মের অনেক ঘটনা দ্রুত জনসমক্ষে নিয়ে আসছে। আগে যেসব ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন সেগুলো মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, ক্ষমতার দম্ভ প্রদর্শন কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ভিডিও নিয়মিত ভাইরাল হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

তবে সমস্যার মূল কারণ শুধু ব্যক্তি নয়; কাঠামোগত দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো কাজের মূল্যায়ন ব্যবস্থা দুর্বল। একজন দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা এবং একজন অদক্ষ ও অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তার মধ্যে পার্থক্য সব সময় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। যে ব্যবস্থায় ভালো কাজের পুরস্কার এবং খারাপ কাজের শাস্তি নিশ্চিত নয়, সেখানে উৎকর্ষতা আশা করা কঠিন।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে যখন বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে তার কর্মজীবনের সাফল্য কর্মদক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই পেশাগত নিরপেক্ষতা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। এটি শুধু প্রশাসনের জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে।

অনেকেই যুক্তি দেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ালে দুর্নীতি কমবে। বাস্তবে পর্যাপ্ত বেতন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এটিই একমাত্র সমাধান নয়। পৃথিবীর বহু দেশে উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। আবার তুলনামূলক কম বেতনেও অনেক কর্মকর্তা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য বেতনের পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহি, দ্রুত বিচার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তদন্ত যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়, অভিযোগ নিষ্পত্তি যেন দ্রুত হয় এবং অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে জনগণের আস্থা কখনোই ফিরে আসবে না।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। অনলাইনে আবেদন, ই-গভর্ন্যান্স এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা দুর্নীতির কিছু সুযোগ কমিয়েছে। তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতা যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যেও নতুন ধরনের অনিয়ম তৈরি হতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সেবামুখী প্রশাসন। সরকারি চাকরি কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরির মাধ্যম নয়; এটি জনগণের সেবা করার একটি দায়িত্ব। এই দর্শনকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও সততার মূল্যায়ন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ঘুষ দিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দুর্নীতি শুধু গ্রহণকারীর নয়, প্রদানকারীরও অপরাধ। সুতরাং রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয় পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতি ও দুর্ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া উন্নয়নের সুফল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। জনগণ এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে সরকারি অফিসে গিয়ে সম্মান পাওয়া যায়, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় এবং আইনের চোখে সবাই সমান থাকে।

দুর্নীতি ও দুর্ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের কাজ নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু এই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই। কারণ রাষ্ট্র যদি কঠোর ও আন্তরিক না হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব স্লোগানই শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। আর যদি সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ অবশ্যই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। এখন সময় এসেছে কথার নয়, কাজের; প্রতিশ্রুতির নয়, বাস্তব পরিবর্তনের।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : JEWEL