বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত দুই দশকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, স্বাস্থ্যখাতে সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় অর্জন। তবে এই অর্জনের সঙ্গে নতুন দায়িত্বও যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো পরিবর্তিত হবে, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ধীরে ধীরে তাদের আর্থিক সহায়তা পুনর্বিন্যাস করবে, এবং স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ করে টিকা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক ভর্তুকি ও সহায়তা ভবিষ্যতে সীমিত হতে পারে।
এটি কোনো আশঙ্কাভিত্তিক বক্তব্য নয়; বরং বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থনীতির একটি সুপরিচিত ধারা। যখন একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তখন আন্তর্জাতিক অংশীদাররা তাদের সীমিত সম্পদ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর দিকে স্থানান্তর করে। ফলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সফল কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত। শিশু মৃত্যুহার কমানো, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে এর অবদান অসাধারণ। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে—যদি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভর্তুকি কমে যায়, তবে এই সাফল্য কীভাবে টেকসই রাখা হবে?
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। যখন বিশ্বজুড়ে টিকার চাহিদা বেড়ে যায়, তখন অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা পায়নি। ধনী দেশগুলো নিজেদের জনগণের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকা সংরক্ষণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কখনোই কেবল বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা যায় না। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা একটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত—দেশীয় ভ্যাকসিন গবেষণা, উন্নয়ন এবং উৎপাদনকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করা।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। এই শিল্পের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে আধুনিক ভ্যাকসিন উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
সরকারের উচিত একটি National Vaccine Security Strategy প্রণয়ন করা, যার মূল লক্ষ্য হবে আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ টিকা দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন। এই কৌশলে গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিল্পখাতের অংশগ্রহণকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এর পাশাপাশি একটি National Vaccine Research and Innovation Centre প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এই কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা গড়ে তুলবে। ইমিউনোলজি, ভাইরোলজি, বায়োটেকনোলজি, জিনভিত্তিক ভ্যাকসিন, mRNA প্ল্যাটফর্ম এবং ভবিষ্যতের উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান শিল্পনীতি এবং স্বাস্থ্যনীতির মধ্যেও ভ্যাকসিন উৎপাদনকে একটি কৌশলগত খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নতুন শিল্প স্থাপনে কর-সুবিধা, গবেষণায় করছাড়, প্রযুক্তি আমদানিতে প্রণোদনা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং সরকারি ক্রয় নিশ্চয়তা (Advance Market Commitment) প্রদান করলে বেসরকারি খাতও এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা (Regulatory Capacity) আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, বায়োসেফটি অবকাঠামো এবং দক্ষ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা ছাড়া ভ্যাকসিন উৎপাদনে বৈশ্বিক আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য গবেষণার সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগ এখনো সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিচালিত গবেষণার ফল অনেক সময় শিল্পে রূপান্তরিত হয় না। এই ব্যবধান দূর করতে Industry–Academia–Government Partnership মডেলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গবেষণার ফল যেন পরীক্ষাগার থেকে উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য উদ্ভাবন তহবিল এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি।
দেশীয় ভ্যাকসিন উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে টিকা আমদানি করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন এই ব্যয় কমাবে, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহিত করবে এবং বাংলাদেশের বায়োফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ভ্যাকসিন রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য। ভ্যাকসিন উৎপাদন একটি পাঁচ বছরের প্রকল্প নয়; এটি দুই থেকে তিন দশকের জাতীয় বিনিয়োগ। তাই সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে যেন এই কর্মসূচির দিক পরিবর্তন না হয়, সে জন্য সর্বদলীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা উচিত।
সবশেষে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো দেশের জনস্বাস্থ্য কখনো স্থায়ীভাবে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। আত্মনির্ভরতা এখন আর একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য কৌশল, একটি অর্থনৈতিক কৌশল এবং একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। প্রথম পথ হলো আগের মতো আমদানিনির্ভর থাকা এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকটের সময় অনিশ্চয়তার ঝুঁকি বহন করা। দ্বিতীয় পথ হলো আজ থেকেই পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দেশীয় উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে তোলা। বিচক্ষণ রাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় পথই হবে সবচেয়ে টেকসই, নিরাপদ এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
আজ যে বিনিয়োগ গবেষণাগারে হবে, আগামীকাল সেটিই বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আর আজ যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্য-সার্বভৌম, আত্মনির্ভর এবং বৈজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করবে।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করেন।