নিজস্ব প্রতিবেদক: অনলাইনে পরিচালিত সংঘবদ্ধ শিশা সরবরাহকারী চক্রের সকল সদস্য গ্রেফতার; ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা, ৪১টি হুক্কাসহ ও বিপুল আলামত উদ্ধার
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ৩রা জুলাই, ২০২৬ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দার অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন,
ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের কাছে গোপন সংবাদ ছিল যে, আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪) নামে দুই সহোদরের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ শিশা ও শিশা সেবনের উপকরণ বিক্রয় ও সরবরাহ করে আসছে। প্রাপ্ত সংবাদের সূত্র ধরে আরও জানা যায়, উক্ত পেজের মাধ্যমে অর্ডারকৃত শিশার দু’টি চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের নিকট প্রেরণ করা হবে।
তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ রেইডিং টিম গত ২রা জুলাই ২০২৬ তারিখ রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা এলাকায় প্রথম অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে উক্ত ফেসবুক পেজের নামে প্রেরিত ০১ কেজি শিশাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। অতঃপর একই দিন রমনা থানাধীন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে প্রেরিত আরও ০১ কেজি শিশাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।
জব্দকৃত পার্সেল দু’টির প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে অভিযানিক দল একই দিনে গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাটে হানা দেয়, যা মূল অভিযুক্ত দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফির ভাড়াকৃত বাসা ছিল। এসময় উভয়কে হাতেনাতে আটক করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
আটক দুই সহোদরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তাদের সরবরাহকৃত শিশার একটি বড় অংশ আসত মোঃ মাকসুদ আলম (৪০) নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ঐদিন রাতে অভিযানিক দলটি নূরেরচালাস্থ তার ভাড়া ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি শিশা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
চার স্থানে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানে সর্বমোট ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি শিশা সেবনের কয়লা এবং মাদক ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত ৫টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
ডিএনসি জানিয়েছে, এটি দেশে এ পর্যন্ত এক অভিযানে জব্দকৃত সর্ববৃহৎ শিশার চালান, যা অধিদপ্তরের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে তারা শিশা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে তারা একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে শিশা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন বলে তদন্তে জানা গেছে। তারা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে শিশা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করা হতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠানো হতো।
চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।
অভিযানে জব্দকৃত মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে আমরা একটি বিস্তৃত গ্রাহক (Client) ডাটাবেস উদ্ধার করেছি। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।
জব্দকৃত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে এই চক্রের বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, অবৈধ শিশা বিক্রির পাশাপাশি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আরও বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা ব্যবহার করে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে। বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, কুরিয়ার সেবা এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে নতুন কৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে। এসব অপরাধ দমনে ডিএনসি তার সাইবার নজরদারি, আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করেছে।