রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বাংলাদেশের জনগণের করণীয় ও এর প্রতিকার: ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান Logo ডিএনসি নোয়াখালী কর্তৃক বিপুল পরিমান ইয়াবা উদ্ধার, শীর্ষ মাদককারবারী গ্রেফতার Logo বাংলাদেশে অপ্টোমেট্রি পেশার ইতিহাসে নতুন মাইলফলক: বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্তি ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত Logo ডিএনসি মৌলভীবাজার কর্তৃক ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর অপেক্ষার সময় কমাতে স্বাস্থ্যসেবা চেইন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান Logo বাংলাদেশের টিকা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব: এখনই দেশীয় ভ্যাকসিন উৎপাদনে জাতীয় বিনিয়োগের সময় Logo আবারো ডিএনসি নোয়াখালী কর্তৃক বিপুল পরিমান ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার Logo ডিএনসি নোয়াখালী কর্তৃক বিপুল পরিমান ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসি যশোর কর্তৃক ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার Logo ডিএনসির অভিযানে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ শিশার চালান জব্দ

কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বাংলাদেশের জনগণের করণীয় ও এর প্রতিকার: ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ন
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বাংলাদেশের জনগণের করণীয় ও এর প্রতিকার
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বাংলাদেশের জনগণের করণীয় ও এর প্রতিকার

বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং এখন আর কেবল শহরের কিছু এলাকার বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবার, শিক্ষা ও ডিজিটাল সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি বড় সংকট। সাম্প্রতিক সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় ও প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ঢাকাসহ দেশের নানা জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলা, চাঁদাবাজি, ছুরিকাঘাত, মাদকসংযোগ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে উসকে দেওয়ার প্রবণতা বারবার সামনে আসছে। দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে ঢাকাসহ সারা দেশে এই সমস্যার গভীরতা তুলে ধরা হয়েছে, আর প্রোথোম আলো একটি সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্যরা মগিং, চাঁদাবাজি, মাদক, অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসা এবং নারীদের হয়রানির মতো অপরাধে জড়িত।

এই সমস্যা বোঝার জন্য প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, কিশোর গ্যাং কোনো একক কারণের ফল নয়। পারিবারিক নজরদারির অভাব, মানসিক সাপোর্টের ঘাটতি, স্কুলে বিচ্ছিন্নতা, বন্ধুবলয়ের চাপ, মাদক, এবং আত্মপরিচয় খোঁজার ভুল পথ—সব মিলিয়ে একজন কিশোর ধীরে ধীরে গ্যাং-সংস্কৃতির দিকে টেনে নেওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টারের একটি মতামতধর্মী লেখায় বলা হয়েছে, দারিদ্র্য, ভাঙা পরিবার, পিয়ার প্রেসার ও স্বীকৃতির অভাব—এসব কারণ কিশোরদের গ্যাংয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইউনিসেফও বলছে, কৈশোরে ডিজিটাল পরিবেশ ঝুঁকি আরও বাড়ায়; সেখানে সহিংসতা, অপব্যবহার এবং গ্যাং বা মিলিশিয়ায় টানার সুযোগ তৈরি হয়।

সংবাদপত্রের বিশ্লেষণে আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কিশোর গ্যাংয়ের প্রচার, হুমকি ও শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছিল, ঢাকায় অন্তত ৮০টি চিহ্নিত টিন গ্যাং সক্রিয় ছিল, এবং টিকটক, লাইকি, ইমো ও ফেসবুকের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার অনেক কিশোরকে বিপথে নিচ্ছে। ২০১৭ সালেই একই পত্রিকা জানায়, কিছু গ্যাং ফেসবুকে ছবি, বার্তা ও হুমকি পোস্ট করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিল। ২০২৪ সালে আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা—বিভিন্ন জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ ক্রমেই সাহসী ও বিস্তৃত হয়েছে। অর্থাৎ, অফলাইনের রাস্তার সহিংসতা এখন অনলাইনের উত্তেজনা দিয়ে আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে।

এখানেই জনগণের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধের প্রথম দেয়াল হলো পরিবার। বাবা-মাকে সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু, অনলাইন ব্যবহার, স্কুলে উপস্থিতি, মানসিক অবস্থা—সবকিছুর প্রতি সচেতন থাকতে হবে। সন্তানকে শুধু বকাঝকা বা ভয় দেখিয়ে নয়, নিয়মিত কথা বলে, শোনার অভ্যাস তৈরি করে, এবং তার সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে কারণ সে ঘরে নিরাপত্তা, স্বীকৃতি বা শ্রবণ পায় না; সে গ্যাংয়ের ভেতরে সেই “পরিবার” খুঁজে নেয়। তাই পরিবারে যোগাযোগ যত শক্তিশালী হবে, গ্যাংয়ের আকর্ষণ ততই কমবে। এ কথার পেছনে আছে ইউনিসেফের সেই পর্যবেক্ষণ, যেখানে বলা হয়েছে অবহেলিত পরিবার, দুর্বল সহায়তা-ব্যবস্থা এবং সামাজিক বঞ্চনা কিশোরদের সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলে।

স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও কম নয়। শুধু পরীক্ষা-নির্ভর শিক্ষা দিয়ে কিশোরকে নিরাপদ রাখা যায় না। স্কুলে কাউন্সেলিং, আচরণগত সহায়তা, সহপাঠী-নেতৃত্ব, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং অ্যান্টি-বুলিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষকরা যদি কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, আক্রমণাত্মক মনোভাব, গ্যাং-স্মারক ব্যবহার বা অনুপস্থিতি দেখেন, তাহলে দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। স্কুলকে কেবল পড়াশোনার জায়গা নয়, চরিত্র গঠনের জায়গা হিসেবেও দেখতে হবে। ২০২৫ সালের বিভিন্ন মতামত ও সম্পাদকীয়তে বারবার বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান সামাজিক শৃঙ্খলার ব্যর্থতার সঙ্গেও যুক্ত; তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীরব থাকা আর চলবে না।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজকেও জেগে উঠতে হবে। কিশোর গ্যাং অনেক সময় মহল্লার অন্ধকার কোণ, খালি মাঠ, অরক্ষিত মোড়, বাসস্ট্যান্ড, নির্মাণাধীন ভবন বা বন্ধ দোকানঘরের আড়ালে জমে ওঠে। তাই এলাকার মানুষকে সন্দেহজনক জটলা, অস্ত্র প্রদর্শন, মোটরসাইকেল শোডাউন, মাদকসংশ্লিষ্ট আড্ডা, কিংবা হুমকিমূলক আচরণ দেখলে চুপ করে না থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কিংবা কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপকে জানাতে হবে। ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙতে হলে নাগরিক সাহস দরকার। যখন সমাজ নীরব থাকে, তখন গ্যাং নিজেদের শক্তিশালী ভাবতে শেখে।

এর পাশাপাশি জনগণকে ডিজিটাল আচরণ নিয়েও সচেতন হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরদের ভুয়া বীরত্ব, অস্ত্র দেখানো, মারামারির ভিডিও শেয়ার, “কমেন্ট যুদ্ধ” এবং দলবদ্ধ উসকানি বন্ধ করতে হবে। অভিভাবকরা সন্তানদের ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কী ধরনের গ্রুপে আছে—এগুলো জানতে হবে। স্কুল ও পরিবারে ডিজিটাল লিটারেসি শেখানো জরুরি, যাতে কিশোররা বুঝতে পারে অনলাইনে তৈরি “স্ট্যাটাস” বাস্তবে তাদের জীবন ধ্বংস করতে পারে। ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল পরিবেশ বুলিং, শোষণ ও বিপজ্জনক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগের নতুন পথ খুলে দেয়; তাই অনলাইন নিরাপত্তা এখন সামাজিক নিরাপত্তারই অংশ।

তবে প্রতিকার শুধু জনগণের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে কঠোর ও মানবিক হতে হবে। যারা অপরাধ করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা দরকার, বিশেষ করে অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ হামলার ক্ষেত্রে। কিন্তু কিশোর অপরাধীকে শুধু শাস্তি দিয়ে থামানো যায় না; পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবারভিত্তিক হস্তক্ষেপও প্রয়োজন। প্রোথোম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে যে বিস্তৃত অপরাধচক্রের চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখায়—শুধু গ্রেফতার অভিযান দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পুলিশের অভিযান দরকার, কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক পুনরুদ্ধার জরুরি।

স্থানীয় সরকার, এনজিও, যুব সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকেও যৌথ ভূমিকা নিতে হবে। মসজিদ, মন্দির, স্কুল ক্লাব, যুবকেন্দ্র, লাইব্রেরি, ক্রীড়া সংগঠন—এসব জায়গা কিশোরদের ইতিবাচক পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি দিতে পারে। যখন কিশোরের হাতে কাজ, খেলাধুলা, পড়াশোনা বা নেতৃত্বের সুযোগ থাকে, তখন সে রাস্তার শক্তির চেয়ে সমাজের স্বীকৃতিকে বেশি মূল্য দেয়। একইভাবে গণমাধ্যমকে খবর প্রকাশ করতে গিয়ে sensationalism এড়িয়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সমাধানকেন্দ্রিক বার্তা দিতে হবে, যাতে গ্যাং-সংস্কৃতি গৌরবের নয়, লজ্জার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বাংলাদেশের জনগণের করণীয় হলো—সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, স্কুলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, অনলাইন আচরণে নজরদারি করা, সন্দেহজনক গ্যাং-তৎপরতা দেখলে প্রতিবাদ ও রিপোর্ট করা, এবং কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, শিক্ষা ও কর্মমুখী সুযোগ তৈরি করা। এর প্রতিকারও বহুমাত্রিক: পরিবারে ভালোবাসা, শিক্ষায় শৃঙ্খলা, সমাজে সক্রিয়তা, রাষ্ট্রে জবাবদিহি, আর ডিজিটাল জগতে দায়িত্বশীল ব্যবহার। কিশোরকে অপরাধী নয়, সম্ভাবনাময় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে গ্যাংয়ের শিকড়ই দুর্বল হয়ে যাবে। যে সমাজ তার কিশোরদের হারায়, সে সমাজ ভবিষ্যৎ হারায়; আর যে সমাজ তাদের সঠিক পথে ফেরায়, সে সমাজই নিরাপদ, মানবিক এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : JEWEL